বিস্তারিত
যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে প্রতিপক্ষ দমনের নীল নকশা
— তুষার মাহামুদ
বিগত ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয়ের পর থেকে তথাকথিত যুদ্ধাপরাধী বিচারের নামে আওয়ামী লীগ প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে উঠে। এ ইস্যুতে দিল্লীর নীল-নকশা বাস্তবায়নে কোমর বেঁধে মাঠে নামে আওয়ামী লীগ ও তার দোসররা। বিশেষ মহলের অর্থায়নে প্রায় তিনযুগ পরে গঠন করা হয় ‘সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম’। আন্দোলনের মাঠে ‘র’ এর অর্থপুষ্ঠ এ ফোরামের একটাই দাবী ছিল ‘যুদ্ধাপরাধের বিচার’। দেশের শান্তিপ্রিয় সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ তখনই প্রশ্ন তুলেছেন, ১৯৭৩ সালে ত্রিদেশীয় চুক্তির মাধ্যমে নিষ্পন্ন হওয়া ‘যুদ্ধাপরাধের বিচার’ আবার নতুন করে এখন কেন? এ দাবির প্রেক্ষিতে বর্তমান আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট ক্ষমতাসীন হওয়ার পর সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের আহ্বায়ক একে খন্দকারকে মন্ত্রী বানিয়ে পুরস্কৃত করা হয়। প্রতিবেশী দেশ ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এর ছক অনুযায়ী মহাজোট সরকার একের পর এক দেশবিরোধী, দেশের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হতে থাকে। দীর্ঘ দু’বছরে সেনা সমর্থিত ফখরুদ্দিন সরকারের অপশাসনে বিধ্বস্ত অবকাঠামো আর ভেঙ্গে পড়া অর্থনীতির পুণর্গঠন না করে মহাজোট সরকার যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে প্রতিপক্ষের ওপর জেল, জুলুম, নিপীড়ন, নির্যাতন ও দমনাভিযান শুরু করে। বিশেষ করে নিয়মতান্ত্রিক ও সুশৃংখল রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর ওপর এতটা ক্ষিপ্ত হওয়ার মূল কারণ ছিল ২০০১ সালের নির্বাচনে অবিশ্বাস্য রকমের ভরাডুবি। তাই এবার ক্ষমতার নাগাল হাতে পেয়েই প্রথমে জামায়াতে ইসলামীকে ম্যাসাকার করার মিশন বাস্তবায়নে মাঠে নেমেছে সরকার। তারই অংশ হিসাবে দলের হাইকমান্ডের নির্দেশে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিকল্পিতভাবে ছাত্রলীগ কর্মী ফারুককে হত্যা করে তার দায়দায়িত্ব ছাত্রশিবিরের ঘারে চাপানোর অপচেষ্টা চলে। ওই হত্যাকাণ্ডের পূর্বাপর আওয়ামী লীগের বহু নেতা, একাধিক মন্ত্রী, ঘাদানিক নেতাদের রাজশাহীতে যাওয়া আসাসহ তাদের সন্দেহজনক গতিবিধি ছিল চোখে পড়ার মত। পরিকল্পিত এই হত্যাকাণ্ডের পর শুরু হলো গণহারে জামায়াত শিবিরের বিরুদ্ধে গ্রেফতার অভিযান। আরো লক্ষ্যণীয় বিষয় ছিল, ফারুক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হলো রাজশাহীতে আর জামায়াত শিবির নেতাদের নির্বিচারে গ্রেফতার চললো সারাদেশে। যা ছিল ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লংঘণ। রিমান্ডে এসব নেতাকর্মীর ওপর দিনের পর দিন যেভাবে অমানুষিক অত্যাচার ও নির্যাতন চালানো হয়েছে যা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানিয়েছে।
এরপর শুরু হলো নিষ্পন্ন হওয়া যুদ্ধাপরাধের বিচারে ট্রাইব্যুনাল গঠন। কিন্তু বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, এক শ্রেণীর অতি উৎসাহী মিডিয়া ও সেসব মিডিয়ায় কর্মরত কিছু চেনামুখ বিচার শুরু হওয়ার আগেই জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতাদের পরিচিতি ও ছবি ব্যবহার করে প্রায় প্রতিদিনই উদ্দেশ্যমূলকভাবে সংবাদ পরিবেশন করে স্বাভাবিক বিচার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে, যা অতিনিন্দনীয় ও ধিক্কারমুলক। কতিপয় মিডিয়ার এ অপতৎপরতা হলুদ সাংবাদিকতার নামান্তর মাত্র।
বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তান এ ত্রিদেশীয় চুক্তির মাধ্যমে চিহ্নিত ১৯৫ জন উর্ধ্বতন পাক সেনা কর্মকর্তাকে সেদেশে ফেরত পাঠানোর পর দেশে আর কোন যুদ্ধাপরাধী নেই। কিন্তু ভারতের মদদপুষ্ট আওয়ামী লীগ দেশের ও আন্তর্জাতিক আইন-কানুনের কোন তোয়াক্কা না করে একান্তই প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীকে হেনস্তা করার জন্যই ক্ষমতার অপব্যবহার করে ‘যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল’ গঠন করেছে। একই সঙ্গে দলীয় লোকজন দিয়ে ৭ সদস্যের তদন্তকারী সংস্থা ও আওয়ামী দলীয় আইনজীবীদের নিয়ে ১২ সদস্যের আইনজীবী প্যানেলও গঠন করা হয়ছে। কিন্তু এসব দলীয় আইনজীবী ও দলীয় লোকদের নিয়ে গঠিত তদন্তকারী সংস্থা নিয়ে এরই মধ্যে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে আইনী প্রক্রিয়ার ছদ্মাবরণে জামায়াতে ইসলামীকে পর্যুদস্ত করা ও জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি নিষিদ্ধ করার জন্যই যে ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হয়েছে তা এখন সর্বস্তরের মানুষের কাছে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, ‘যুদ্ধাপরাধী’ বলে চিহ্নিত করে কারো বিরুদ্ধে কোন মামলা মোকদ্দমা না হলেও দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের নাম, ছবি কিভাবে মিডিয়ায় প্রকাশ পায় তা প্রশ্ন সাপেক্ষ। এ ছাড়াও তথাকথিত যুদ্ধাপরাধী উল্লেখ করে কয়েকটি চিহ্নিত পত্রিকা যে ৩৬ জনের নাম প্রকাশ করেছে তাও-বা কতটা আইনসিদ্ধ? সংবাদপত্র, মিডিয়া ও সাংবাদিকতার কোন নীতিমালায় পরে এ অপতৎপরতা?
সবচেয়ে বড় তামাশার বিষয় হলো, প্রায় ৩৯ বছর পূর্বে যে শিশুটির বয়স ছিল মাত্র ৪ বছর, হাটি হাটি পা পা করে যে শিশুটি সবেমাত্র হাঁটতে শিখছে। যখন তার শিক্ষালয়ে যাওয়ার বয়সও হয়নি তাকেও ‘যুদ্ধাপরাধী’ চিহ্নিত করে ৩৬ জনের তালিকা প্রকাশ করেছে দিল্লীর অর্থপুষ্ট চিহ্নিত মিডিয়াগুলো। ১৯৭১ সালে ১০ বছরের দুরন্ত শিশুটিকেও বানানো হয়েছে তথাকথিত ‘যুদ্ধাপরাধী’। মৃত ব্যক্তিকেও ‘যুদ্ধাপরাধী-বানাতে কসুর করেনি আমাদের অঘটন ঘটন পটিয়সী মিডিয়া। এ সম্পর্কে গত ২৮ মার্চ দৈনিক আমার দেশ এ ‘যুদ্ধাপরাধীর তালিকায় মৃত ও ওই সময়ের শিশুরা, ‘শিরোনামে প্রকাশিত এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, সম্প্রতি প্রকাশিত ৩৬ জনের তালিকায় ‘৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ৪ থেকে ৮ বছর বয়সের শিশু রয়েছেন ৩ জন। তালিকায় এএনএম ইউসুফসহ কয়েকজন মৃত ব্যক্তির নামও রয়েছে। ৩৬ জনের তালিকায় জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগর আমীর মোঃ রফিকুল ইসলাম খান ১৯৬৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লপাড়া উপজেলার নওকৈড় গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ছিলেন বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা মোঃ খোরশেদ আলম খান। ২৬ মার্চ মুক্তিযুদ্ধ শুরুর দিন তার বয়স ছিল সাড়ে ৪ বছর। ১৯৯১ সালে তিনি এমএ পাশ করেন। ওই সময়েই ছাত্র শিবিরের সভাপতি পদ থেকে অবসর নেয়ার পর তিনি জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। অর্থাৎ ১৯৯২ সালে তিনি জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতিতে অভিষিক্ত হন। অথচ তাকেই কিনা ‘যুদ্ধাপরাধী’ চিহ্নিত করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন ওঠে, চার বছর অথবা ১০/১২ বছর বয়সের কোন শিশুর পক্ষে ‘যুদ্ধাপরাধ’ করা সম্ভব কিনা ? অথচ সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করে তুলেছে ‘ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’, ‘সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম’, তথ্য সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠান ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটিসহ ‘র’এর অর্থায়নে সদস্য গজিয়ে ওঠা কিছু স্বঘোষিত সুবিধাভোগী সংস্থা। যুদ্ধাপরাধীদের এ তালিকায় খুলনার জামায়াত নেতা মিয়া গোলাম পরওয়ার ও চট্টগ্রামের মাওলানা শামসুল ইসলামসহ আরো কয়েকজন অল্প বয়স্ক নেতার নাম রয়েছে। ১৯৭১ সালে যাদের বয়স ছিল ৮-১০ বছর। হাস্যকর বিষয় হলোÑ আন্তর্জাতিক অপরাধের আওতায় হত্যা, ধর্ষন, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ ও জোর করে মুক্তিযোদ্ধাসহ নিরীহ মানুষকে দেশ থেকে বের করে দিয়ে অবৈধভাবে তাদের ঘরবাড়ি দখলসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে তাদের বিচার হবে। এর এ জন্যই গঠন করা হয়েছে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল। কিন্তু ‘৭১ সালের কচি বয়সের শিশুদের পক্ষে উপরোল্লিখিত ‘যুদ্ধাপরাধ’ সংঘটিত করা আদৌ সম্ভব কিনা এবং তাদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ ধোপে টিকবে কি না, বিশেষ মহলের উদ্দেশ্য সাধনে সদা তৎপর সুবিধাভোগী চক্রটি কিন্তু তা একবারও ভেবে দেখেনি।
সুতরাং তাদের এ অপতৎপরতা থেকে স্পষ্টই বোঝা যায়, প্রতিপক্ষ দমন ও জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি নিশ্চিহ্ন করার জন্যই উদ্দেশ্যমূলকভাবে ‘যুদ্ধাপরাধ’ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, একটু গভীরভাবে লক্ষ্য করলেই বিষয়টা আরো স্পষ্ট হয়ে উঠবে, বিগত ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর যে ক’জন শীর্ষ নেতা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, অথবা অল্প ভোটের ব্যবধানে যারা আওয়ামী প্রার্থীর কাছে পরাজিত হয়েছেন। আগামীতে যাদের বিজয় সুনিশ্চিত, বেছে বেছে তাদেরকেই ‘যুদ্ধাপরাধী’ বলে চিহ্নিত করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। যারা সততা ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নির্বাচনে লড়াই করে প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার মত জনপ্রিয় নেতা, তাদেরকেই উদ্দেশ্যমূলকভাবে ‘যুদ্ধাপরাধী’ বানানোর চেষ্টা চলেছে। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সরকারের উদ্দেশ্য পরিষ্কার, ‘যুদ্ধাপরাধী’ আখ্যায়িত করে পথের কাঁটা সরিয়ে দিয়ে আগামীতে নির্বাচনে আওয়ামী প্রার্থীর বিজয় নিশ্চিত করার মাধ্যমে ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করা। যুদ্ধাপরাধীদের এ তালিকায় অসঙ্গতি প্রসঙ্গে খোদ আইন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েই প্রশ্ন উঠেছে। সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নেতানেত্রীরা যতই বিচারে স্বচ্ছতার কথা বলুক তাদের কথায় কেউই আস্থা রাখতে পারছেন না। কারণ মিথ্যাচার ক্ষমতাসীন দলটির মজ্জাগত স্বভাব। তাই বিচারে আন্তর্জাতিক মানদন্ড বজায় থাকবে কিনা এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে সন্দেহ ঘণীভূত হচ্ছে। একই সঙ্গে মিডিয়ায় প্রকাশিত ‘যুদ্ধাপরাধীদের’ তালিকা নিয়ে এরই মধ্যে নানা মহলে প্রশ্ন উঠেছে। সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের দেয়া ৫০ জনের তালিকা, ৩৬ জনের তালিকা নাকি ২৫ জনের তালিকা কোনটি সঠিক। আরো প্রশ্ন উঠেছে, তদন্তকারী সংস্থা, আইনজীবী প্যানেল, বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের আগেই কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী কি করে বলেন, যুদ্ধাপরাধীরা ফাঁসির দড়ি এড়াতে পারবেন না। তার এ বক্তব্যের মাধ্যমে বিচার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করারও অভিযোগ উঠেছে।
আওয়ামী আয়োজিত বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নির্মূলে যে প্রহসনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হচ্ছে, তাতে সংশয় প্রকাশ করেছে জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। বিএনপি মহাসচিব এড: খন্দকার দেলোয়ার হোসেন, সাবেক স্পীকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, বিএনপি স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য এমকে আনোয়ারসহ দলের বর্ষীয়ান নেতারা সংশয় প্রকাশ করে বলেছেন, দলীয় লোকদের নিয়ে গঠিত তদন্তকারী সংস্থা, দলীয় আইনজীবীদের নিয়ে গঠিত আইনজীবী প্যানেল, দলীয় মন্ত্রী আর আওয়ামী স্বপ্ন বাস্তবায়নে গঠিত বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে সুবিচার পাওয়ার আশা করা বাতুলতা মাত্র।
Popularity: 25%